দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ঝালকাঠি পৌরসভার প্রায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, অসমাপ্ত খাল খনন এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব, নিম্নমানের কাজ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল খনন, সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, ফুটপাত নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন গোরস্থান নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও অধিকাংশ কাজ হয়েছে দায়সারাভাবে। এতে নাগরিক দুর্ভোগ কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. কাওছার হোসেন। তাঁর দায়িত্বকালেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পৌর এলাকার সাতটি খাল খননের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সাতটির মধ্যে ছয়টি খালের কাজ শুরু হলেও শেষ হয়নি এবং একটি খালের কাজই শুরু করা হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খননকাজ অসমাপ্ত রেখে দেওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। খালগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। এ প্রকল্পে অর্ধেকেরও কম কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে রাস্তা কার্পেটিং, সিসি ঢালাই, ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ৮৫০ মিটার ড্রেন, ৫০০ মিটার ফুটপাত এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এডিবি প্রকল্পের আওতায় জরুরি মেরামতের জন্য ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং পৃথকভাবে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৭৫ মিটার রাস্তার কার্পেটিংয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ কাজেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার ও স্থানীয়রা। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলকে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ না করায় প্রকল্পের আর্থিক তথ্য গোপন রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পৌর এলাকার কলেজ রোডের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত রাস্তার কার্পেটিং শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই উঠে যেতে শুরু করেছে। উন্নয়নের নামে নিম্নমানের কাজ করে জনগণের অর্থ অপচয় করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসিব হাওলাদার বলেন, খাল খননের নামে খালগুলো নষ্ট করে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মশার উপদ্রব বেড়েছে এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঝালকাঠি জেলা স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ হাওলাদার অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় স্থানে ড্রেন নির্মাণ না করে অগ্রাধিকারহীন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুবিনুল ইসলাম সাদ্দামের দাবি, সাবেক প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, আগে যে ধরনের একটি রাস্তা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় সংস্কার হয়েছিল, একই ধরনের রাস্তার জন্য এবার ১৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রকল্পের নামফলকে বরাদ্দের তথ্য উল্লেখ থাকলে জনগণ প্রকৃত চিত্র জানতে পারত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, জেলা সুজনের সম্পাদক ও টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার খাল খনন প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ৭০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলকে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করা উচিত এবং বিষয়টি সুজন ও টিআইবির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম. রেজাউল হক রিজভী বলেন, খাল খননের প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী বিল দেওয়া হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিংয়ে ত্রুটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম বা ত্রুটি প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক পৌর প্রশাসক মো. কাওছার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
যে আই